অবশেষে তিথির অনেক স্বপ্নগুলির একটি, আর মাত্র দুই দিনের মধ্যে পূরণ হতে চলেছে। তিথি উত্তেজনায় রীতিমতো কাঁপছে। তিথির লেটেস্ট তিনটি স্বপ্নের একটি হচ্ছে, কানাডাতে নিজের জন্য বা স্বামী তমালের  জন্য প্রফেশন্যাল জব ম্যানেজ করা, দ্বিতীয় স্বপ্ন হচ্ছে, নায়াগ্রা ফলসে বেড়াতে যাওয়া এবং তৃতীয় স্বপ্ন হচ্ছে কানাডাতে লেকের ধারে একটি বাড়ি কেনা।

তৃতীয় স্বপ্ন আপাতত অনেক অনেক দূরের পথ, তবে প্রথম স্বপ্নটির অবস্থা বেশ শোচনীয়, চাকরির বাজারের অবস্থা যেমন তেমন এখানে একেকজনের একেক ধরণের পরামর্শের কারণে কোত্থেকে কিভাবে ক্যারিয়ার শুরু করবে তিথিরা ঠিক বুঝে উঠতে পাচ্ছে না। এরই মধ্যে, তমালের ফ্যাক্টারীর জব থেকে ওকে ফায়ার করেছে। এখন পর্যন্ত, দেশ থেকে আনা জমানো টাকা দিয়ে আর বাচ্চার জন্য সরকার থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে সংসার চলছে। দেশে ফিরে যাবে, নাকি এখানে থেকে যাবে এসব নিয়ে তমালের সাথে তিথির প্রায়ই কথা কাটাকাটি হচ্ছে।সুতরাং, বাকি থাকছে শুধু দ্বিতীয় স্বপ্ন। 

তিথি গত দুই দিন ধরে তমালের সাথে কথা বলেনি। কখনো ভাববাচ্যে কখনোবা ছেলের মাধ্যমে কখনোবা চিরকুটে লিখে কথা চালাচালি হচ্ছে। আজ তমাল দুপুর বেলা যখন একটি চিরকুট লিখে তিথির হাতে দিলো, তিথি সব রাগ অনুরাগ ভুলে আনন্দে লাফিয়ে উঠে তমালকে জড়িয়ে ধরলো। তমাল চিরকুটে লিখেছিলো , ‘পরশুদিন ৬ ই সেপ্টেম্বর সোমবার, লেবার ডে-র লং উইকেন্ডে আমরা বন্ধু পরাগের সাথে নায়াগ্রা ফলস দেখতে যাচ্ছি।’

আগামী কালের নায়াগ্রা ফলসে যাওয়া উপলক্ষে উপরতলায় তিথিদের বেজমেন্টের মালিক সোবাহান সাহেবের লিভিংরুমে মিটিং চলছে। তিথিদের সাথে পরাগের পরিবার ছাড়াও সোবাহান সাহেবও ওদের সাথে যাচ্ছেন। সোবাহান সাহেব অনেক বছর ধরে কানাডায় আছেন, এ জীবনে কম করে হলেও ৪০/ ৫০ বার নায়াগ্রা ফলসে গেছেন, তাই নায়েগ্রা ফলসে যাওয়ার ব্যাপারে সোবাহান সাহেবের তেমন আগ্রহ নেই । কিন্তু উনার স্ত্রী একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বড় মেয়ের বাসায় ফ্লোরিডাতে এক মাসের জন্য বেড়াতে যাওয়ায় কিছুটা একা একা লাগছিলো, তাই তিথিরা নায়েগ্রা ফলসে যাওয়ার প্রস্তাব দিতেই সোবাহান সাহেব অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলেন।

সোবাহান সাহেব যুবক বয়সে সুইডেন গিয়েছিলো। সেখানে বছর দশেক থাকলেও খুব বেশী সুবিধা করতে না পেরে কানাডায় সপরিবারে বসবাস শুরু করেছে প্রায় আশির দশকে। সুইডেন থেকে মোটামুটি যা কামাই করে এনেছিলেন এখানে এসে ইটোবিকক এলাকাতে একটি ফ্লিয়া মার্কেটে লাগেজ/সুটকেসের দোকান দিয়েছিলেন। প্রথম প্রথম স্ট্রাগল করলেও পরের দিকে ব্যাবসা বেশ জমে উঠেছে। পরাগ একবার দেশে যাওয়ার সময় সস্তায় লাগেজ কিনতে ফ্লিয়া মার্কেটে গিয়েছিলো, তখন থেকেই সোবাহান সাহেবের সাথে পরিচয়, পরে বন্ধুত্ব। উনার বেজমেন্ট এক মাস ধরে খালি পরে থাকায় পরাগ দেশ থাকা আসা বন্ধু তমালদের জন্য সোবাহান সাহেবের বেজমেন্টে ভাড়া ঠিক করে দিয়েছিলো।

নায়াগ্রা ফলস ভ্রমণ বিষয়ক মিটিংএ ভ্রমণের খাওয়া দাওয়া নিয়ে কথা উঠতেই সোবহান সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বলে বসলেন, ‘টিপিক্যাল বাঙ্গালীদের মতো বাসায় রান্না করে খাবার দাবার নিয়ে যাবার কোনো মানেই হয় না, মহিলাদের খালি খালি কষ্ট দেওয়া, সকাল সকাল যাবো, যাওয়ার পথে টিমহর্টন এ নেমে কফি /টফি খেয়ে নিলেই হবে, আর ওখানে যেয়ে এক্সট্রা লার্জ সাইজের পিজ্জা কিনে নিলেই হয়ে গেলো, অত ভাবার কি আছে! আমরা তো আর দাওয়াত খেতে যাচ্ছি না, আমরা যাচ্ছি নায়াগ্রা ফলস পরিদর্শনে।

কিন্তু, পরাগের দর্শন আবার আলাদা। পরাগের কথা হচ্ছে, শুধু পিজ্জার টুকরা খেয়ে সারাদিন থাকা যাবে না, এক জায়গায় বেড়াতে যাচ্ছি যখন, দুটা ভাল মন্দ রান্না করা খাবার আয়েস করে খেলাম, গালগল্প করলাম অনেকটা পিকনিক পিকনিক মেজাজ থাকলো, তাছাড়া, যদিও ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা, কিন্তু লং উইকেন্ডে রাস্তায় প্রচুর ভিড় হবে, কোথায় কখন খাবার কিনে খাবে, তার চেয়ে বাসায় থেকে চিকেন বিরানি রান্না করে নেয়া যেতে পারে, সেই সাথে বাচ্চাদের জন্য পাস্তার আইটেম থাকলেও থাকতে পারে।

অবশেষে, পরাগের প্রস্তাব সবাই মেনে নিলো, পরাগের বৌ বকুল চিকেন বিরানি রান্না করবে, তিথি চিকেন ব্রেস্ট আর ভেজিটেবল দিয়ে পাস্তা রান্না করবে আর সোবহান সাহেব সালাদ, থালা.বাটি, পানিতে বোতল, কোল্ড ড্রিঙ্কস নিবে।

তিথি সন্ধ্যার দিকেই হাতের সব কাজ সেরে আগেভাগে পাস্তা রান্নার সবকিছু গুছিয়ে রাখতে চাইলো, খুব ভোরে ফজর নামাজ পড়ে রান্না বসিয়ে দিলেই হবে, পাস্তা রান্না করতে বেশি সময় লাগবে না। তিথি সকাল বেলায় চিকেন ব্রেস্ট ছোট ছোট করে কেটে হালকা মসলা দিয়ে মেরিনেট করে রেখেছিল, শুধু কিছু সবজি ধুয়ে কুটে বেছে রাখলেই হবে। তিথির হটাৎ পাস্তার কথা মনে হতেই বুকের ভিতর ছাঁৎ করে উঠলো। আসল জিনিসটা খেয়ালই ছিল না, বাসায় পাস্তা আছেতো !! কিচেন ক্যাবিনেট খুলতেই দেখে যা ভেবেছিলো তাই, প্যাকেটের তলানির দিকে সামান্য কিছু পাস্তা। ভাগ্যিস ওয়ালমার্ট রাত এগারোটা পর্যন্ত খোলা থাকে। তিথি তমালকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাসে করে ওয়ালমার্টে যেয়ে পাস্তা কিনতে পাঠালো।

ভোরে উঠতে হবে, তাই তিথি সকাল সকাল বিছানায় ঘুমাতে গেল। বেডের পাশেই রিডিং
টেবিলে বাপ ব্যাটা ইন্টারনেটে নায়াগ্রা ফলস নিয়ে গবেষণা করছে। তিথি সেই ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন দেখে আসছিলো নায়েগ্রা ফলসে যাবে, আগামীকাল সে স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। উত্তেজনায় তিথির কিছুতেও ঘুম আসছে না । তিথি একসময় স্বামীর বন্ধু পরাগের বৌ বকুলকে ফোন দিলো:-
-‘কি বকুল, ঘুমিয়ে পড়েছো ?’
-অরে না, কি যে বলেন আপা, এতো সকালে ঘুমাবো, কেবল মাত্র বিরানি ওভেনে বসিয়েছি আরও ঘন্টা খানিক পরে ওভেন অফ করে ঘুমাতে যাবো, সকাল বেলা ওভেন হালকা ওয়ার্রমে দিয়ে বড় দুইটি হটপটে তুলে নিয়ে যাবো, খাবার গরম থাকবে। ব্যাটা ছেলেরাতো খাবারের অর্ডার দিয়েই খালাস, সব ঝামেলা যায় আমাদের উপর দিয়েই। কি দরকার ছিল বাসা থেকে খাবার রান্না করে নিয়ে যাবার, আপনেই বলেন আপা, একদিন না হয় সবাই বাহিরেই খেতাম।’ তিথি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললো,
-‘বকুল, তুমি যখন প্রথম নায়াগ্রা ফলস দেখতে গিয়েছিলে তোমাকে কেমন মনে হচ্ছিলো, একটু বলবে ?’-আপা, সত্যই কথা যদি বলি, আপনার মতো আমার খুব শখ ছিল নায়াগ্রা ফলস দেখার। আমরা কানাডায় আসার তিন দিনের মাথায় বাসে করে নায়াগ্রা ফলস দেখতে গিয়েছিলাম। আমি ভাবছিলাম, অনেক অনেক উঁচু পাহাড় থেকে বিশাল জলরাশি নিচে পড়বে, অনেক মজা করে দেখবো, কিন্তু ওখানে যেয়ে যা দেখলাম বিশাল এক লেকের পানি অনেক উপর থেকে কলকল করে শব্দতুলে অনেক নিচে পড়ছে, সত্যি কথা কি আপা, আমি খুব বেশি অবাক হই নাই। তারমধ্যে, আমরা প্রথম যেদিন গেলাম টিপ্ টিপ্ করে বৃষ্টি হচ্ছিলো তাই, খুব একটা ভালো করে দেখা হয়নি। কিন্তু, আপনার ভাইয়ের চোখেমুখে কি যে আনন্দ। আপনার ভাই ওখানে যেয়ে এক গাদা টিকেট কিনে আনলো। একটি টুরিস্ট মিনিবাসে আরোও অন্যান্য টুরিস্টসহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে ঘুরে বেড়ালাম। একটি প্রকান্ড ঘড়ির ওখানে যেয়ে আপনার ভাই আনন্দে চিৎকার করে বললো,’বকুল, এটা হচ্ছে ফ্লোরাল ঘড়ি, ফুলের বাগানে ঘড়ি, কি অদ্ভুত না, এখানে দূর দর্শন সিনেমার শুটিং হয়েছিল, বুঝলে, ভালো করে দেখে নাও। ফ্লোরাল ঘড়ি যেমন তেমন, মানুষটার আনন্দ দেখে আমার খুব মায়া লাগলো, আমি ইচ্ছা করে খুব অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বললাম ‘আমার কত কপাল! কী চমৎকার জায়গায় আমাকে নিয়ে এসেছো। আমি এ জীবনে কখনো এতো সুন্দর জায়গায় আসিনি। বোকা মানুষটা আমার কোথায় আরো উত্তেজিত হয়ে বললো, ‘ সবই আল্লাহ্পাকের ইচ্ছা বকুল, আমরা হচ্ছি কেবল উছিলা। আরে, সুন্দরের দেখছো কী? এখনতো তোমাকে এখানকার আসল জিনিসই দেখাতে নিয়ে যায়নি, কয়েক মাস অপেক্ষা করো, দেখবে ফল সিজনে চারিপাশের গাছ গাছড়ার পাতা রঙিন হয়ে উঠেছে, তোমাকে সেসময়ে উত্তরের পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাবো তোমার কাছে মনে হবে তুমি বেহেস্তে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখছো।’ তিথি হাই তুলে বললো, ‘আজ থাক বকুল। আমার ঘুম পাচ্ছে, কালতো দেখা হচ্ছেই, কালকে আলাপ করা যাবে।’

তিথি শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে, আসলে প্রাপ্তিতে বোধ হয় আনন্দ নেই। মানুষ খুব বিচিত্র প্রাণী। কামনা, বাসনা, আকাঙ্খা, শখ আহ্ললাদ প্রভৃতি স্বপ্ন অবস্থাতেই যত ভালো লাগে, একবার স্বপ্নের দেখা পেয়ে গেলে সেগুলি ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তাই, স্বপ্ন যতক্ষণ স্বপ্ন থাকে ততদিনই যা মজা। এই কানাডার কথাই ধরা যাক, এক সময় এই কানাডায় আসার আগে তিথির কাছে কানাডা নিয়ে কত রঙ্গিন সব স্বপ্ন ছিল, কিন্তু এখানে এসে …..। তিথির মাথায় হঠাৎকরে এক অদ্ভুত ভাবনা আসে, কালকে এতো স্বপ্নের নায়াগ্রা ফলসে যাওয়াটা ক্যানসেল করলে কেমন হয়! তিথির ভয় হয়, ওখানে যেয়ে যদি বকুলের মতো তারও ভালো না লাগে, তার চেয়ে তার মানসপটে স্বপ্নের নায়াগ্রা ফলস অধরাই থাকুক। কাজটি খুব সোজা, শুধু সকালে ঘুম থেকে উঠে তমালকে বলবে.’তমাল, আমার মাইগ্রেনের ব্যাথা উঠেছে, আজকের নায়াফ্রা ফলসে যাওয়া প্লিজ ক্যানসেল করো।

তমাল নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। পাশের রুমে তিতাসের টেবিল ল্যাম্প এখনো অন, রাত সাড়ে বারোটার মতো বাজে। তিথি এপাশ ওপাশ করেও ঘুম আসছে না। তিথি বিছানা থেকে উঠে পাশের রুমে যেয়ে দেখে তিতাস টেবিলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে, নায়েগ্রা ফলসের কিছু আকর্ষনীয়া জায়গার তথ্যাবলী, ছবি টেবিলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ছেলেটির জন্য তিথির বেশ মায়া লাগলো। অটিস্টিক এই ছেলেটিকে নিয়ে তিথির অনেক অনেক স্বপ্ন কিন্তু কানাডাতে এসে চাকরি/বাকরি ও সেটেল্ড হওয়া নিয়ে এতো ঝামেলা দিয়ে যাচ্ছে, ছেলেটিকে সময়ই দিতে পাচ্ছে না ।

তিথি তিতাসকে ডেকে তুলে বিছানায় শুয়ে দিতেই তিথির ফেসবুক মেসেঞ্জারে ফোনের রিং হচ্ছে। এতো রাতে ফোন, সম্ভবত বাংলাদেশ থেকে ফোন। যা ভেবেছে তাই, তিথি ফোনে ক্লিক করতেই দেখে ছোট ভাই মন্টুর ফোন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিথি কল রিসিভ করলো।
-‘ আপা, তোরা নাকি কাল নায়াগ্রা ফলস দেখতে যাচ্ছিস ? শোন আপা, আর যাই করিস আমার জন্য কিন্তু কয়েকটি সুভেনিয়ার কিনতে কিন্তু ভুলবি না, আমি বন্ধুদের দেখিয়ে দেখিয়ে বলবো আমার বড় আপা কানাডা থেকে পাঠিয়েছে। ‘ তিথি ঘুমাতুর কণ্ঠে বললো,’মন্টু এসব জায়গায় সুভেনিয়ার অনেক দামে বিক্রি হয়, অসুবিধা নাই, দেখি দুই/একটি তোর জন্য কিনে রাখবো, আজ থাকরে, কাল সকালে উঠতে হবে।’

পরাগের সাত সীটের ডজ ক্যারাভান কুইন এলিজাবেথ ওয়ের (QUW ) এর উপর দিয়ে বার্লিংটনের কোল ঘেঁষে নায়াগ্রা ফলসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরাগের পাশে বসেছে সোবহান সাহেব। পরাগ, বকুল তিথি আর তিতাস বসেছে পিছনের সীটে। পরাগ -বকুলরা ওদের ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে আসেনি। সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় দেখে মেয়েটির হালকা জ্বর, তাই বকুল মেয়েটিকে বেবিসিটারে কাছে রেখেছে এসেছে। বকুল মেয়েকে রেখে আসতে চাইনি, পরাগের পীড়াপীড়িতে রাজি হতে হয়েছে, ওরা না গেলে তিথিদের নায়াগ্রা ফলস এবারের মতো আর দেখা হবে না, বন্ধু বলে কথা !!

একসময় ওদের গাড়ি একটি বিশাল উঁচুতে ব্রিজের উপর উঠলো। গা ছম ছম করা অবস্থা। পরাগ ড্রাইভিং সিট থেকে ব্যাক মিররে তিথির দিকে তাকিয়ে বললো,’ ভাবি, এটির নাম হচ্ছে বার্লিংটন স্কাই ওয়ে, ১৯৫৮ সালে এটি সে সময়ে ১২ মিলিয়ন ডলার খরচ করে নির্মিত হয়েছিল, নিচের দিকে তাকান কী সুন্দর না ভাবি !’ তিথি অবাক হয়ে দুই পাশের লেক দেখছে আর সমানে ছবি তুলে যাচ্ছে আর ওদিকে বকুল রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে জানালায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

তিথিরা যখন নায়াগ্রা ফলস থেকে মাত্র মিনিট দশেক দূরে আছে, টিপ্ টিপ্ বৃষ্টি শুরু হলো। তিথির মন খারাপ হয়ে গেলো, বৃষ্টির মধ্যে সাধের নায়াগ্রা ফলস ভালো ভাবে দেখায় হবে না। আবার, মনের মধ্যে ছোট্ট একটি আশা উঁকি দিচ্ছে, সকালের ওয়েদার নিউজে বৃষ্টির উল্লেখ ছিল না, হয়তো কিছুক্ষন পরেই থেমে যাবে।

তিথির মনের আকাঙ্খা পূরণ হলো, নায়াগ্রা ডাউন টাউনের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা দিয়ে নায়াগ্রা ফলসের কাছে তিথীরা যখন এলো বৃষ্টি থেমে ঝলমলে সকালের রোদ হেসে উঠেছে। অবশেষে, সেই মহেন্দ্রক্ষণ। তিথির চোখের সামনে নায়েগ্রা ফলস। তিথি গাড়ির জানালা নামিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। প্রচন্ড শব্দে বিশাল বিশাল জলরাশি অনেক উঁচু থেকে আছড়ে পড়ছে। তিথি উচ্ছসিত হয়ে বলে উঠলো,’ও মাই গড !!’

এখানে গাড়ি এক দন্ডের জন্য রাখার কোনো উপায় নেই, হুট্ করে পুলিশ চলে আসবে, ভালো করে নায়াগ্রা ফলসের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে গাড়ি পাকিং লটে পার্ক করে পায়ে হেঁটে ঘুরে ঘুরে দেখতে হবে। পরাগ ও সোবাহান সাহেব আরো খানিকটা এগিয়ে পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে, ওয়াশরুম থেকে ফ্রেস হয়ে সবাই নায়াগ্রা ফলসের কাছাকাছি এসে নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখছে। কেবল সোবাহান সাহেব সবার জন্য কফি আনার জন্য অনেকক্ষণ হলো উধাও হয়েছে। কম কথা বলা স্বভাবের ছেলে তিতাস নায়াগ্রা ফলস নিয়ে বাবাকে সমানে প্রশ্ন করে যাচ্ছে। বকুলরা যেহেতু আগেও অনেকবার এসেছিলো তাই নায়াগ্রা ফলস নিয়ে তেমন বেশী তিথির মতো করে আবেগ নেই। বকুল তিথিকে টুরিস্ট গাইডের মতো বললো : ‘আপা, ওই যে ওপারে বিল্ডিং দেখছেন, লোকজন দেখছেন ওটা কিন্তু আমেরিকা, ওই আমেরিকার ওই জায়গার নাম হচ্ছে ‘বাফেলো’ যা নিউইয়র্ক এর মধ্যে। আপনাদের যখন কানাডিয়ান পাসপোর্ট হয়ে যাবে আপনারা ওই ব্রিজ দিয়ে পার হয়েই আমেরিকা যেতে পারবেন।’

বকুলের কাছে আমেরিকা দেখা বা যাওয়া যতখানি গুরুত্বপূর্ণ তিথির কাছে এই চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা অনেক অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই, তিথি পলকহীন চোখে এই বিস্ময়কর দৃশ্যাবলে দেখছে, ছেলেকে দেখাচ্ছে। তমাল সমানে ছবি তুলে চলেছে। দূর থেকে বিশাল লেকের পানি ছোট ছোট ঢেউয়ের আকারে এদিকটায় ধেয়ে এসে জলপ্রপাতের কাছে এসে প্রচন্ড শব্দে নিচে যে জায়গায় আছড়ে পড়ছে, সেখানে পানিগুলি সাদা সাদা ফেনার মতো দেখাচ্ছে ।

কিছুক্ষন আগের থেমে যাওয়া বৃষ্টির কারণে ফলসের উপরে আকাশে রংধনু উঠেছে । তিথি আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো হাততালি দিচ্ছে। দেশে শহরের কৃত্রিম পরিবেশে গিজ গিজ করা লোকালয়ে অনেকদিন রংধেনু দেখা হয়নি। তিথি ছোটবেলায় বই এ পড়া ‘বেণী আসহ কলা’ সূত্র ধরে ছেলেকে বুঝাতে থাকে, ‘বাবা ওই যে সবচেয়ে প্রথম রং এটি হচ্ছে ‘ভায়োলেট’. পরেরটি ব্লু……’। নায়াগ্রা ফলস ও রংধেনুর সমন্বয়ে অপূর্ব এই দৃশ্য দেখে এমুহুর্তে তিথির তার জীবনের সব কষ্ট, দুঃখের স্মৃতি ভুলে যেয়ে আনন্দে আনন্দে ভেসে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে।

সোবাহান সাহেব এক ট্রে কফি নিয়ে হন্দন্ত হয়ে এসে বললেন, একবারে সবার জন্য বোটের টিকেট কিনে আনলাম, একটু এক্সপেন্সিভ, এডাল্টের জন্য $35.32 আর বাচ্চাদের জন্য $24.02 , কিন্তু তাতে কী ! টাকার কথা সবসময় ভাবতে হয়না, বোটে না উঠে নায়াগ্রা ফলসের কিছুই বুঝা যাবে না তাই সবার জন্য কিনে ফেললাম। পরাগ সাহেব, আপনার পরিবারের জন্য $70.64, এখন ক্যাশ না থাকলে বাসায় যেয়ে ইট্রান্সফার করে দিয়ে দিয়েন, আমাদের আবার ছোটোখাটো জিনিস মনে থাকে না। আর হ্যা, তমাল সাহেবদের ব্যাপার আলাদা, নিউকামার ফ্যামিলি, উনাদের জন্য মাফ।’

তিথির কাছে সোবহান সাহেব লোকটি খুব রহস্যপূর্ণ বলে মনে হয়, মাঝে মাঝে মনে হয় একেবারে হাড়কিপ্টে, উনি ভালো করেই জানে ওদের চাকরিবাকরি আয় রোজগার নেই, তবুও এক পয়সা ভাড়া কমাবে না, মাস গেলে গুনে গুনে বেজমেন্টের দুই রুমের জন্য আটশত পঞ্চাশ টাকা নিবে আবার ইউটিলিটির বিল আলাদা। তমালের যখন ফ্যাক্টারীর চাকরি চলে গেলো, সোবাহান সাহেবের যে কী টেনশন, তমালকে নিয়ে স্থানীয় একটি কমিউনিটি সংস্থায় নিয়ে যেয়ে ই আই (EI : Employment Insurance ) তে এপ্লাই করার জন্য খুব দৌড়াদৌড়ি করলেন, কিন্তু অবশ্য লাভ হয়নি, ই আই-তে থাকার জন্য যতদিন কাজ করতে হয় বেচারা তমালের ততদিন কাজ করা হয়নি।

সোবাহান সাহেবের নের্তৃত্বে তিথিরা সবাই নায়াগ্রা ফলসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বোট রাইডের জন্য পায়ে হেঁটে হেঁটে ডান দিকে নায়াগ্রা ফলসের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখতে দেখতে এগিয়ে চলছে। সোবাহান সাহেব সমানে বকবক করেই চলেছেন-

‘বুঝলেন ভাবি, আমরা অনেকেই জানি না, নায়াগ্রা ফলসে আসলে তিনটি ফলস রয়েছে, সব চেয়ে পিছনেরটা যেটি আমরা এই মাত্র দেখে আসলাম সেটি হচ্ছে The Canadian Horseshoe Falls এছাড়াও এখানে বাকি দুইটি ফলস হচ্ছে : The American Falls and the Bridal Veil Falls, একেকটির একেক ধরণের সৌন্দর্য। নায়াগ্রা ফলসের হাইট হচ্ছে প্রায় ২০০ ফুটের মতো, পৃথিবীতে প্রায় পাঁচ শতাধিক ফলস আছে যেগুলি নায়াগ্রা ফলসের চেয়েও উঁচু, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ফলসের নাম হচ্ছে ভেনিজুয়েলার The Angel Falls সেটির উচ্চতা হচ্ছে ৩২১২ ফুট। তবে সৌন্দর্য ও পানির প্রবাহের দিক দিয়ে নায়াগ্রা ফলস অনেক ফলসের চেয়ে অনেক বেশি আলাদা।’

কথা বলতে বলতে সোবাহান সাহেবের ক্ষুদে ভ্রমণ দলটি বোট রাইডের কাছে চলে এসেছে। কাউন্টার থেকে সবাইকে রঙিন পলিথিনের স্পেশাল ড্রেস দেওয়া হলো। সেগুলি গায়ে দিয়ে তিথিরা সবাই বোটের অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়িয়েছে। সোবাহান সাহেব সবাইকে সাবধান করে দিয়েছেন কেউ যেন এদিক ওদিক না যেয়ে সবাই একসাথে ডেকের দিকে থাকে তাহলে ভালো করে ফলস দেখা যাবে। তিথি উত্তেজনায় ছটফট করছে কখন বোটে উঠেবে।

কাটায় কাটায় দুপুর সাড়ে বারোটায় তিথিদের বোট ছেড়ে দিলো। ধীর লয়ে ওদের বোট ফলসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তমালের কাছে এই বোটে চড়ার অভিজ্ঞতা হচ্ছে সৌন্দর্য ও ভয়াবহতার এক ধরনের কম্বিনেশন। ওদের বোটটি যখন দুলে দুলে Horseshoe ফলস এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তমাল ভয়ে শিউরে উঠছে। দূর থেকে আরেকটি বোট দেখা যাচ্ছে, সোবহান সাহেব চেঁচিয়ে বললেন, ওই দেখেন ওটি হচ্ছে আমেরিকান বোট, ওদের বোটে দেখেন আমেরিকার ফ্ল্যাগ লাগানো, আর আমাদের বোটে কানাডিয়ান ফ্ল্যাগ।’

একসময় তিথিদের বোটটি একেবারে Horseshoe ফলস এর গা ঘেসে এসে পড়েছে, প্রকান্ড শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছে না, চারিপাশে শুধু কুয়াশার মতো, পাশের জনকেও দেখা যাচ্ছে না। তিথি আনন্দে আত্মহারা হয়ে একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে আছে। বকুল তিথির কানের কাছে চিৎকার করে বলছে ‘আপা, আমি আসলে এতবার নায়াগ্রা ফলস এসেছি, এই বোটে কোনো দিন উঠি নাই, সত্যই এই বোটে না উঠলে নায়াগ্রা ফলসের কিছুই বুঝতে পারতাম না। তিথিদের বোট টি একসময় কুয়াশা কেটে তীরের দিকে ফিরে আসছে। তিথি হঠাৎ করে খেয়াল করলো তার পশে থাকা ছেলে তিতাস নেই।

তিথি চিৎকার করে তমালকে বললো তিতাস কৈ?’ তমাল বলল ‘ও তো তোমার হাত ধরেই ছিল।’ তিথি তিতাসের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকছে, কিন্তু তিতাসের সাড়াশব্দ নেই। সোবাহান সাহেব দৌড়ে বোটের ককপিটে ক্যাপ্টেন সাহেবকে জানাতেই বোটের স্টাফরা সারা বোট তন্ন তন্ন করে খুঁজলো, তিতাসকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তমাল, পরাগ, সোবাহান সাহেব সবাই তিতাস তিতাস বলে চিৎকার করতে করতে বোটের এমাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত দৌড়ে বেড়াচ্ছে, তিতাস কোথাও নেই।

তিথি বোটের ফ্লোরে বসে গগনবিদারী চিৎকার করে বিলাপ করে কাঁদছে, বকুল তিথির হাত ধরে আছে, ওদের ঘিরে জটলা করে কিছু মানুষ উৎসুক ভাবে তাকিয়ে আছে। বোটের ক্যাপ্টেন সাহেব ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করায় পুলিশের স্পেশাল বোট ডুবুরির দল নিয়ে তিথিদের বোটের দিকে ধেয়ে আসছে। একপর্যায়ে তিথি অজ্ঞান হয়ে বকুলের হাতে মাথা রেখে ঢলিয়ে পড়লো।

লেক সুপেরিওরের পানির স্রোত লেক অন্টারিওর দিকে যাওয়ার পথে নায়াগ্রা ফলসে প্রবল দাপটে প্রকান্ড শব্দে নিচে পড়ছে। নিচের সেই পানির স্রোত কুল কুল করে এঁকেবেঁকে লরেন্স নদী হয়ে আটলান্টিকের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দূরে Horseshoe ফলস এর উপরের আকাশে এখনো রংধনু জ্বল জ্বল করছে। আকাশে কিছু সাদা সাদা সিগার্ল বোটের উপর দিয়ে চক্কর খাচ্ছে। কিছু দর্শনার্থী বোট থেকে আকাশে ব্রেডের টুকরা সিগার্লগুলির দিকে ঢিল ছুড়ে মারছে। সিগার্লগুলি কিচিরমিচির শব্দ করে সেগুলি এক্রোবেটিক কায়দায় নিচে গোত্তা খেয়ে  গিলে গিলে খাচ্ছে। অনেকেই মজা পেয়ে হাততালি দিচ্ছে। কিছু টুরিস্ট দম্পতি যত্ন করে সমানে ছবি তুলে যাচ্ছে। বোটের আরেক প্রান্তে জ্ঞান হারা তিথির হাত ধরে তমাল মূর্তির মতো বসে আছে।

—————(চলবে)

আগের পর্বগুলির জন্য ক্লিক করুনঃ-

স্বপ্নের ইমিগ্রেশন-পর্ব ১
স্বপ্নের ইমিগ্রেশন-পর্ব ২

স্বপ্নের ইমিগ্রেশন-পর্ব ৩

স্বপ্নের ইমিগ্রেশন-পর্ব ৪

 

পূর্ববর্তী নিবন্ধভিনদেশী এক বসের গল্প
পরবর্তী নিবন্ধবাড়িয়ে দাও হাত-পর্ব ১৩
জাকারিয়া মুহাম্মদ ময়ীন উদ্দিন
জাকারিয়া মুহাম্মদ ময়ীন উদ্দিন (জন্ম: ১৯৬৬ ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে উন্নয়ন কর্মী হয়ে দেশীয় ও আন্তজার্তিক অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাকুরী শুরু করেন এবং তখন থেকেই লেখালেখিতে মনোনিবেশ। তবে লেখালেখি শুরুটা ছিল সেই হাইস্কুল জীবনে পাড়ার বড় ভাইদের প্রকাশিত ম্যাগাজিন 'অবসর' নামক পত্রিকার মাধ্যমে। ২০০৩ সালে কানাডায় সপরিবারে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করে, আবারও পড়াশুনা, প্রথম Humber College থেকে সোশ্যাল সার্ভিস বিষয়ে দুই বছরের ডিপ্লোমা, পরে University of Guelph থেকে ফ্যামিলি & কমিউনিটি সোশ্যাল সার্ভিস বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে আবারও উন্নয়ন কর্মী হিসাবে রেজিস্টার্ড সোশ্যাল সার্ভিস ওয়ার্কার হিসাবে ২০১০ সাল থেকে অদ্যাবধি টরেন্ট ভিত্তিক বিভিন্ন অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর করছেন । লেখকের কয়েকটি জনপ্রিয় ধারাবাহিক গল্পপ্রবাসী ব্লগ, কানাডা ভিত্তিক একটি সাপ্তাহিক বাংলামেইল পত্রিকায় এবং মাসমিডিয়াতে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার পরে ঢাকায় ২০২৩ সালের একুশে বইমেলায় লেখকের তিনটি বই হোমলেস, সিঙ্গেল মাদার, জোসনা ম্যানশন উপন্যাস আকারে প্রকাশিত হয় । বর্তমানে হাউজ হাজব্যান্ড নামে লেখকের আরেকটি জনপ্রিয় ধারাবাহিক কে উপন্যাস হিসাবে ২০২৪ সালের ঢাকা একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে । মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখকের একটি জনপ্রিয় গল্প 'শেকড়' ২০২১ সালে বাংলাদেশের বুকল্যান্ড প্রকাশনা থেকে ৫০ লেখকের ভাবনা নিয়ে পঞ্চাশে বাংলাদেশ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছিল। গল্প/উপন্যাসের পাশাপাশি কবিতা, প্রবন্ধ লেখা ছাড়াও খেলাধুলা নিয়েও লেখকের অনেক লেখা রয়েছে।

আপনার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন