IMG_9918

লেখাটি শুরু করেছিলাম গত উইকএন্ডের রাতে। দেশে আমার ছোট বোনের হাসবেন্ডের একটি সার্জারি চলছিল তাই বেশ টেনশনে ছিলাম। নামাজ পড়লাম, দোয়া কালাম পড়লাম, কিছুক্ষন বই পড়লাম কিন্তু মনটা কিছুতেই ভালো হসছিলো না এবং কোনো ক্রমেই ঘুম আসছিলোনা। এই ধরণের মুহূর্তে আমি কিছু কাজ করে থাকি সেলফ কেয়ারের জন্য, যেমন গরম কাল হলে একাকী কোনো লেকের পারে গাছের ধারে বসে থেকে পানি আর আকাশ দেখা, কোনো কিছু রান্না করা অথবা মনে যা আসে তাই কাগজে লেখা। মধ্য রাতে তৃতীয় অপসন ছাড়া আর দুটি সম্ভব ছিল না তাই কম্পিউটার নিয়ে বসলাম কিছু লেখার মাধ্যমে মনটাকে একটু ডাইভার্ট করতে এবং অধীর অপেক্ষার মুহূর্তগুলি পার করার জন্য।

কত কিছুই মনে হসছিলো, তবে সিদ্ধান্ত নিলাম কোনো ইমোশনাল কিছু নয়, গত সামারের ছোট খাটো একটি এডভেঞ্চারের কথা লিখি। এডভেঞ্চারের সাথে একটু চ্যালেঞ্জ মিশ্রিত ছিল তাই ভাবলাম এটাই হবে যথাপযুক্ত বিষয়। এটা ছিল গত সামারে আমাদের তৃতীয় এবং শেষ ক্যাম্পিং প্লাস ফিশিং ট্রিপ। আর এই ট্রিপটি ছিল শুধুমাত্র ছেলেদের, বিশেষ করে আমাদের দুই টিন-এজ ভাতিজাকে নিয়ে। একজন আমার নিজের ভাতিজা, অন্য জন ভাইয়ের বন্ধুর ছেলে, এবং ওই ভাতিজাকে তার পরিবার এই প্রথম একা ক্যাম্পিংয়ে যেতে দিলেন। উল্লেখ উনারা গত সামারের জীবনে প্রথম আমাদের সাথে পুরা পরিবার সহ একেবারে rustic ক্যাম্পিংয়ে গিয়েছিলেন এবং তাদের অনেক ভালো লেগেছিলো।  দুই ভাতিজাসহ আমাদের সঙ্গে ছিল আমার ঘনিষ্ঠ বনধু কাজী জহির ওরফে টোকন ভাই। ওরা সবাই ক্যাম্পিং এর সাথে মাছ ধরারও খুব ইসছা করছিলো তাই ফিশিংটা সঙ্গে এড করেছিলাম। সঙ্গে একদিনের একটি গলফিংও জুড়ে দিয়েছিলাম।

IMG_9905

এক ভাতিজার জন্য এটা ছিল জীবনে গলফের হাতে খড়ি। ওহ! ওদের নাম মুগ্ধ এবং রিশাদ।

সিদ্ধান্তটি বলতে গেলে হটাৎ করেই নেওয়া হয়েছিল, তাই সুবিধামতো ক্যাম্পিং পেতে একটু বেগ পেতে হয়েছিল। যাহোক আমাদের টার্গেট ছিল নর্থে যাওয়ার। এর আগে দুবার sudbury থেকে ৫০ কিঃমিঃ দক্ষিণে ফ্রেঞ্চ রিভার এর পাড়ে নোয়েলভিল নামক খুব ছোট একটি শহরে ক্যাম্পিং এ গেছি, উক্ত সাইটে এবারো যাওয়ার ইসছা ছিল কিন্তু রেনোভেশনের জন্য ওরা বন্ধ থাকায় অন্য জায়গা খুঁজতে হলো। একটি কথা বলে নেই, যেহেতু টিন-এজ ভাতিজাদের নিয়ে যাওয়া, তাছাড়া এই ব্যস্ততম টরোন্টোর জীবন থেকে একটু স্বস্তি পাওয়া তাই খুজছিলাম এমন একটি সাইট যেখানে কোনো সেল ফোন বা ইন্টারনেট কানেক্শন থাকবে না। জীবনটা সেই এক যুগ আগের মতো উপভোগ করা এবং ভাতিজাদের দেখানো যে সেল ফোন, FB বা টেক্সটিং ছাড়াও জীবন চলতে পারে।

IMG_9916

বেশ খোজ খুজির পরে ফিশ টেল নামক ক্যাম্পিং এন্ড কটেজ এর একটি টেন্ট সাইট পাওয়া গেলো। এক সিনিয়র দম্পত্তি প্রপার্টিটির মালিক এবং তারাই বেবসাটি চালান। এখানে ক্যাম্পসাইট, কটেজ এবং ট্রেইলার সাইটও আছে। ঠিক ফ্রেঞ্চ রিভার নদীটির পারে। উল্লেখ এই নদীটি নর্থ বের নিপিসিং লেক থেকে নেমে প্রায় ৩০০ কিঃ পাড়ি দিয়ে জর্জিয়ান বে লেকে পড়েছে। আগেকার দিনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ছিল। ক্যাম্পসাইটে নদীর পারে একটি সুন্দর ডেকও আছে, যেখানে সন্ধ্যায় বসে বসে মাছ ধরা বা গল্প করা, ছবি তোলা, বোট লঞ্চ করা, ইত্যাদি করতে পারেন। ওই রিমোট এলাকায় এবং বলতে গেলে জঙ্গলের মধ্যেও ওদের একটি ছোট সুইমিং পুল আছে এবং সেটা অত্তান্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অর্থ্যাৎ well maintained . দিনশেষে ওখানে গিয়ে দু চারটি ডুব দিয়ে প্রতি দিন খুব ভালো লাগতো। ওদের কাছে ছোটো স্পিড বোটও পুরা বা অর্ধেক দিনের জন্য ভাড়া পাওয়া যায় খুব রিসোনাবল দামে। আমরা মোটামুটি পুরো দিনের জন্যই ভাড়া করেছিলাম কারণ মাছ ধরতে যাওয়া ছাড়া মাঝে মধ্যে নদীর মধ্যে ঘুরতে যাওয়াও দরকার ছিল। ওখানে থাকা অবস্থায় মাঝ নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া ছাড়াও একদিন সবাই মিলে ওখান থেকে প্রায় আধ ঘন্টার পথ দূরে একটি গল্ফ কোর্সে গল্ফ খেলতে গিয়েছিলাম, বেশ সস্তায়।

IMG_9931

টরোন্টোর পশ্চিম পাস্ থেকে আমি আর টোকন ভাই সকালে রওয়ানা হলাম স্কারবোরোর দিকে, কারণ ভাতিজারা ঐদিকেই থাকে। তাদেরকে তাদের বাবা-মার কাছ থেকে বুঝে নিয়ে রওয়ানা হলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। টরোন্টো থেকে সাড়ে তিন বা চার ঘন্টার পথ হলেও আমরা নিয়েছিলাম ৪ ১/২ ঘণ্টা কারণ আমরা বেরির আগ পর্যন্ত HWY ৪০০ দিয়ে না গিয়ে কিছুটা গ্রামের মধ্যে দিয়ে গেছি, এবং পথে ২/৩ জায়গাতে ব্রেক নিয়েছি যাতে করে কোনো boring বা exaust ফীল না হয়। বেরির ঠিক একটু পরেই HWY ৪০০ এর পাশে En Routeএ আমরা আমাদের প্রথম বিরতি নিলাম। ওখানে আমরা আমাদের বাসাথেকে নেওয়া খাবার খেলাম এবং টিম হর্টন থেকে চা কফি নিলাম। বাসাতে আমাদের আপডেট জানালাম। এর পর ড্রাইভার পরিবর্তন করে রওয়ানা হলাম French River এর উদ্দেশ্যে। HWY ৪০০ ধরে কিছুক্ষন চলার পর রাস্তাটি sudburyর উদ্দেশ্যে যাওয়া HWY ৬৯ হয়ে যায়। এই রাস্তা দিয়ে যেতে খুব একটা বোরিং লাগে না কারণ রাস্তার দুই পাশে সবুজ গাছপালা, কখনো উঁচুনিচু প্রান্তর অথবা ছোট বড়ো লেক এবং উপরে নীল সদা আকাশ ইত্যাদি দেখতে দেখতে আর গান শুনতে শুনতে ড্রাইভ করতে ভালোই লাগে।

এসে গেলাম পোর্ট সেভার্ন, নিলাম একটি ওয়াশরুম বিরতি। বলে নেই, আপনাদের সাথে বাচ্চা থাকলে এখানে অপেক্ষাকৃত একটি বড়ো বিরতি নিতে পারেন।  এখানে টিম হর্টন সহ আরো কিছু খাবারের দোকান এবং ওয়াশরুমের ভালো বেবস্থা আছে। লেকের পাড়ে সুন্দর ছোট একটি পার্ক এবং বিচও আছে। মোটামুটি সবাই মিলে ছোট্ট একটা পিকনিক করে নেওয়া যায়, আবার খুব বেশি গরম লাগলে পানিতে নেমে একটা ডুব দিয়ে নিলে পরবর্তী পথ খুব ভালোভাবে যাওয়া যাবে। পার্কটি HWY ৬৯ এর একদম কাছে। এখানে ইসছা করলে একদিনের ট্যুরেও যাওয়া যায়।

IMG_9923

পাহাড় কাটা, আর সবুজ গাছপালার মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা এবং উঁচুনিচু রাস্তা ধরে আমরা চলতে থাকলাম আমাদের পরবর্তী বিরতি ফ্রেঞ্চ রিভার ট্রেডিং পোস্টের  দিকে। একসময় পৌঁছে গেলাম সেখানে। কোনো রকম বিরক্তি ছাড়াই পার হয়ে গেলো প্রায় ৪ ঘন্টা। এখানে একটি সুন্দর রেস্টুরেন্ট আছে, যেখানে ওয়াশরুমটি ভালো। তবে খাবারের দাম তুলনামূলকভাবে একটু বেশি কারণ এটি অনেক উত্তরে। জায়গাটি খুব সুন্দর। পাশে আদিকালের ট্রেডিং পোস্টের কিছু নমুনা করে একটি ছোট জাদুঘরের মতো আছে। মাঠের মধ্যে অনেক প্যাডিও টেবিল বসানো আছে, যেখানে আপনি আপনার বাসার খাবার দিয়ে একটি ক্ষুদ্র যাত্রা বিরতি টাইপ পিকনিক করতে পারেন। আমরা কিছু স্নাক্স, ওয়াশরুম এবং বাসাতে আপডেট সেরে আবার রওয়ানা হলাম আমাদের আসল গন্তব্যের দিকে।  এখান থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের পথ তাই একটু relaxlyই গেলাম। সম্ভবত বেলা সাড়ে তিনটার দিকে গিয়ে পৌছালাম।

 

IMG_9947ওদের অফিসে রেজিস্ট্রেশনসন সারলাম। ওরা আমাদের সাইট দেখিয়ে দিলো। একদম লেকের পাড়ে, বোট লঞ্চ এবং পানিতে ডেকের কাছে। শেষ মেশ পাওয়া গেলেও আমরা সাইটটি দেখে মজা পেলাম। দ্রুত টেন্ট সেট আপ করে কিছু খেয়ে নিলাম। এর পর ভাতিজারা চলে গেলো সুইমিং পুলে , আমি আর টোকন ভাই গেলাম বোট রেন্ট করতে। ফিরে  এসে ভাতিজাদের এবং মাছ ধরার সরঞ্জামাদী নিয়ে বোট স্টার্ট করে রওয়ানা হলাম নদীর উদ্দেশ্যে। পড়ন্ত বেলার একটু চিট চিটে গরমে নদীর মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া হালকা ঠান্ডা ফুর ফুঁড়ে হাওয়ায় ঘুম লাগছিলো, যাহোক সেটা হয়নি কারণ আমি একমাত্র লাইসেন্স ধারি চালক ছিলাম তাই আমাকে চালকের ভূমিকা নিতে হয়েছিল।

মাঝ নদীতে বেশ কিছুক্ষন চেষ্টা করার পরে কোনো লাখ না হওয়ায় আমরা চলে গেলাম নদীর পাড় ঘেঁষে একটু কোনার দিকে অপেক্ষাকৃত অল্প পানিতে। মোটামুটি নিচে মাটি দেখা যায়। বোট এঙ্কর করলাম। ওরা তিনজন পানিতে ছিপ ফেলে মাছের অপেক্ষায় থাকলো। এইবার আমি কিছুটা রেস্ট পেলাম। আমাদের আর কোনো ছিপ ছিল না তাই আমি আর মস্য শিকারে অংশ নেই নি। খুব বেশি দেরি করতে হলো না, ওরা মাছ পাওয়া শুরু করলো। মাছগুলি ছোট ছোট কিন্তু ওগুলোকে ধরা দেখতে আমার খুব ভালো লাগছিলো। ভাতিজা মুগ্ধর জীবনে এটা ছিল প্রথম মাছ ধরার অভিজ্ঞতা যদিও দেশে তার দাদা এবং বাবা এ বেপারে খুবই আগ্রহী এবং পারদর্শী ছিলেন। আমার ওর উত্তেজনা দেখে খুব ভালো লাগছিলো। এই সময়টিতে বাসায় থাকলে হয় পড়ে থাকতো কোনো কম্পিউটার গেম, টিভি অথবা সেল ফোনে চ্যাট   নিয়ে কিন্তু এখানে সেটা সে বেমালুম ভুলে গিয়ে মেতে আছে মাছ ধরার আঁনন্দে। মনে মনে ভাবছিলাম আমার উদ্দেশ সফল হতে চলেছে। ওদিকে ভাতিজা রিশাদ তো বলতে গেলে পেশাদার মস্য শিকারী কারণ তার বাবা মনজুর ভাইয়ের সাথে সে অনেকবার গেছে।  সে মূলত বেলা পড়ার সাথে সাথে মাছের গতিবিধি সম্মন্ধে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত অবগত করছে, আর আমি তার কথা মতো বোটকে বিভিন্ন জায়গাতে নিয়ে এঙ্কর ফেলছি। এক পর্যায়ে একটি ছিপ ভেঙে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে আমরা বোটের মধ্যে থাকা বৈঠা দিয়ে একটি make-shift ছিপ

বানিয়ে ফেললাম। খুবই ফানি দেখাসছিল যদিও। সূর্যের আলো কমতে শুরু করলো এবং মাছেরাও প্রস্থান করতে থাকলো তাই আমরা অন্ধকার হওয়ার আগে ক্যাম্পের দিকে রওয়ানা হলাম।

IMG_9934

ক্যাম্পে ফিরে আবার সবাই মিলে চলে গেলাম সুইমিং পুলে। বেশ কিছুক্ষন সাতরানোর পর সঙ্গে নেওয়া পাস্তা রান্না করলাম, তারপর ডিনার সারলাম। টোকন ভাইতো একেবারে নদীর মধ্যে ভাসতে থাকা ডেকের উপর রাখা বেঞ্চের উপরে বসে নদীর পাশে গাছের উপর দিয়ে অস্তমান সূর্যের দৃশ্য দেখতে দেখতে একেবারে ন্যাচারাল রেটুরেন্টে বসে তার সুস্বাধু পাস্তা খেতে লাগলেন। খাওয়া শেষে আমরা নদীর মধ্যে ডেকে বসে কিছু ছবি তুলে গল্প করতে থাকলাম আর ভাতিজারা ডেকের উপর থেকে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে লাগলো।

এভাবে সন্ধ্যা হয়ে গেলো।  মনেই হলো না প্রায় সাড়ে ৪/৫ ঘন্টা জার্নি করে এসেছি। ওখানে বসে সমস্ত ক্লান্তি কেটে গেলো। ক্যাম্পে যেহেতু কোনো সেল ফোনের সিগন্যাল ছিল না তাই ক্যাম্প থেকে জাস্ট কিছুটা দূরে ভাতিজাদের নিয়ে গেলাম ১৫ মিনিটের জন্য তাদের বন্ধু বান্ধবের সাথে যোগাযোগের জন্য। আর এদিকে আমি আর টোকন ভাই আপডেট করলাম আমাদের ফ্যামিলিকে। ১৫ মিনিট পরে ফিরে এলাম ক্যাম্পসাইটে। এর পর ওয়াশরুম সেরে আমরা ঢুকে পড়লাম টেন্টের মধ্যে। ভাতিজারা তাদের কম্পিউটারে সেভ করা একটি মুভি দেখতে লাগলো। টোকন ভাই ঘুমিয়ে গেলেন।  আর আমিও পরবর্তী দিনের গল্ফ কোর্সের বুকিংটা চেক করে ঘুমিয়ে গেলাম। সবার এক টানা খুব ভালো ঘুম হলো।

পরবর্তী পর্বে লিখবো আমাদের গলফিং নিয়ে এবং বিশেষ করে মাঝ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক দূরে চলে যাওয়া এবং হটাৎ করে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে। লিখবো কিভাবে আবার পথ খুঁজে পেলাম, কি কি জিনিস শিখলাম, কি কি জিনিস কাজে লেগেছিলো ইত্যাদি নিয়ে। এবং একটি চ্যালেঞ্জকে কিভাবে ফানে রুপান্তরীত করা যায়। সে পর্যন্ত অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন।

[asa]B00UFIBVHI[/asa]

[asa]B01LKXSA2U[/asa]

আপনার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন