বেশ অনেক বছর আগে ২০০৪ সালের কথা। তখন আমি ইসলিংটন সাবওয়ের কাছে থাকি। ওখানে ছোট খাটো একটা বাংলাদেশী কমিউনিটি ছিলো। ছিলো বললে হয়তো ভুল হবে কারণ এখনো অনেক বাঙালী পরিবার ওখানে থাকেন। বেশ কয়েকটা বহুতল বিশিষ্ট ভবন আছে ওখানে। আছে কিছু সরকারের অনুদান প্রাপ্ত আবাসস্থল। কমুনিটির সূত্র ধরেই ওখানে ছিল একটা বাঙালী ডলার স্টোর। যার স্বত্তাধাকারী ছিলেন স্বপন সরকার , সবার কাছে দাদা নাম পরিচিত ছিলেন।

কলেজ জীবন থেকেই আড্ডাবাজ ছিলাম। যেখানেই যাইনা কেন আড্ডার সঙ্গী খুঁজে নিতে বিলম্ব হতোনা। আড্ডার স্বার্থেই পরিচয় হয়েছিল দাদার সাথে।
স্বপন দাদা হচ্ছেন আমার কানাডার প্রবাস জীবনের প্রথম বন্ধু আর আজও যার সাথে নিয়ামত যোগাযোগ আছে। পরিচয় হবার পর থেকে আমার নিত্যদিনের কাজ ছিলো , অফিস থেকে ফেরার সময় এক বড় কফি নিয়ে দাদার দোকানে যাওয়া। তার পর দুজনে ভাগ করে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কফি পান আর সিগারেট টানা। সেই সাথে চুটিয়ে আড্ডা। এই ভাবেই চলতো সন্ধ্যা পর্যন্ত। দাদার দোকানেই পরিচয় হতো নতুন নতুন বাংলাদেশি লোক জনের সাথে।

এখানেই পরিচয় হয়েছিল রউফ ভাইয়ের সাথে। উনি আসতেন বইয়ের ফটো কপি করতে। প্রয়াসই আসতেন ফটোকপির জন্য। প্রতিবার ১০০/২০০ পেজ ফটোকপি করতেন। কাজ শেষে আমাদের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলে কিছুটা সময় কাটাতেন। তার পর বাসার উদ্যেশে চলে যেতেন। এভাবেই পরিচিত হয়ে ছিলাম ওনার সাথে। ৩-৪ বছর এই ভাবে কাটলো। তার পর দাদা তার ব্যাবসা গুটিয়ে নিলেন। তারপর মাঝে মাঝে পথে ঘাটে দেখা হতো রউফ ভাইয়ের সাথে। অত্যান্ত সাদামাটা একজন মানুষ , অতি সাধারণ পোশাক , হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ যার মধ্যে থাকতো শুধু বই। কখনো ঘুনাক্ষরেও জানতে পারিনি কি প্রতিভাবান ছিলেন এই ব্যাক্তি। শুধু আমি নই , ওই অঞ্চলের বাংলাদেশি কমুনিটির কেউই হয়তো জানতেন না এই প্রতিভাবান ব্যাক্তিত্বকে । সবাই জানতো উনি শুধু পড়াশুনা নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন। তাইতো কৌতুহলবশত একবার জিজ্ঞসা করেছিলাম , ভাই আর কত দিন পড়াশুনা করবেন? জবাবে বলেছিলেন “হাফিজ ভাই , সুযোগ আছে পড়াশুনা করার, পড়তে অসুবিধা কোথায়? পড়ারতো আর শেষ নেই।” তখনো কি জানতাম একজন বোকা ছাড়া ওনার মতন একজন শিক্ষিত ব্যাক্তিকে এই প্রশ্ন কেউ করতে পারে না।

আজ দুপুরে রউফ ভাইয়ের (প্রফেসর ড.কাজী আবদুর রউফ) মৃত্যু সংবাদ জানলাম তার বন্ধু আক্তার হোসাইন ভাইয়ের ফেসবুক থেকে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। জানলাম অনেক না জানা কথা। তারই কিছুটা তুলে ধরলাম এখানে।
আক্তার হোসাইন ভাই লিখেছেন :-
Quote –
“প্রফেসর ড.কাজী আবদুর রউফ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রিসটন বিশ্ববিদ্যালয়, নোবেল বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন।
তিনি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ত্রাণ তহবিল সংস্থার পরিচালক হিসেবে বিশ্বের ১২০টি দেশ ভ্রমন করেন। বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর জন্য নিজের প্রাপ্ত অর্থ থেকে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ত্রাণ তহবিলে দান করেছেন।”
Unquote

পরবাসী ব্লগের পক্ষ থেকে রউফ ভাইয়ের শোকসম্পত পরিবারের প্রতি রইলো আমাদের সমবেদনা।

(ছবিটা আক্তার ভাইয়ের ফেসবুক থাকে নেয়া )

আপনার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন