যেসময়ের কথা বলছি সেসময়ে  লেখালেখি নিয়ে তুমুল ব্যাস্ত আমি । দৌড়াদৌড়ি আর ছাপার অক্ষরে  লেখা ও নাম দেখার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরাঘুরি প্রতিদিন। তন্ন তন্ন করে পত্রিকার পাতা খুঁজি আমার লেখা আছে কী না!  লেখা ও পত্রিকার পেছনে দৌড়ানো ছিল নিত্যদিনের কাজ। কখনো একা, কখনো সহলেখক বন্ধু, কখনো কবি আ.শ.ম বাবর আলীসহ পত্রিকা অফিসে   দৌড়াদৌড়ি করি। লেখা ছাপা হলে ঐ পত্রিকার ২/৩ কপিও ক্রয় করে ফেলি। কেউ কেউ পত্রিকার সৌজন্য সংখ্যাও প্রদান করতেন। কী এক উন্মাদনা তখন! সে এক অন্য জগত! ভিন্ন ধরনের আনন্দ।     এখন এটি চিন্তাও করা যায় না।

আমার কাছে এমন এমন পত্রিকাও আছে যেখানে আমার লেখা নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত থেকে প্রকাশিত হতো বাংলা দেশের ন্যাপ- কমিউনিস্ট পার্টির ” মুক্তিযুদ্ধ ”   শীর্ষক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। বিশেষ ব্যাবস্হায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে পত্রিকাটি পাঠানো হতো এবং আমরা হাতবদল করে করে পাঠ করতাম। পত্রিকার সে কী চাহিদা আর আনন্দ!

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ” মুক্তিযুদ্ধ ” পত্রিকাটির প্রথম বর্ষ ৫ম সংখ্যাটি আজও আমার হেফাজতে আছে। পত্রিকাটির বয়স ৪৯ বছর। ভাবছি, যদি এটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দিতে পারতাম!

ঘাটতে ঘাটতে ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্র ও গোলাবারুদ সমর্পণের রশিদটি  পেয়ে গেলাম। সমর্পণের দরখাস্তটি লেখা হয়েছিল কুমিল্লা সদর উত্তর ও দক্ষিণ মহকুমার জাতীয় মিলিশিয়া শিবির প্রধানকে সম্বোধন করে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধাদের পক্ষ থেকে দরখাস্তের নীচে স্বাক্ষর করেন যথাক্রমে মুস্তাফিজুর রহমান, জাকির হোসেন, হেদায়েত উল্লাহ এবং মোঃ ওমর ফারুক। দরখাস্তে লেখা ছিল,

  “… … বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  আহ্বানে অদ্য আমাদেরকে দেয়া ও দখলীকৃত সমুদয় অস্ত্রশস্র ও গোলাবারুদ সমর্পণ করিলাম।… এই সঙ্গে অস্ত্রশস্র ও গোলাবারুদের একটি তালিকা দেয়া হইল… ” ।

ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা  কাগজে স্বাক্ষর ও সীলমোহর দিয়ে আমাদের অস্ত্রশস্র ও গোলাবারুদ বুঝে নেন (ফটোকপি সংযুক্ত)। এরপর একটি পাতলা কম্বল আর একটি নামেমাত্র সুয়েটার দিয়ে আমাদের বিদায় জানানো হয়।

এধরণের অনেক চিঠি, স্মৃতিচিহ্ন, ছবি, নোটবই, ডায়েরী ও পত্রিকা আমার সংরক্ষণে ছিল, কিন্তু এখন আর নেই। আজ যা আছে কিছুদিন পর হয়তো  তা-ও আর থাকবে না।

আমার সংগ্রহের আরেকটি পত্রিকার কথা বলতে হয়।  একসময়ে আমি ঐ পত্রিকাটির একজন নিয়মিত পাঠক ছিলাম। পত্রিকাটির নাম “যায় যায় দিন “। যায়যায়দিনের  বর্ষ ২ সংখ্যা ২৮ মঙ্গলবার ২৯ জুলাই ১৯৮৬ সংখ্যাটি এখনও আমার সংগ্রহে আছে। লে. জে. হো. মো . এরশাদের শাসনামলে  ” সংসদের শোভা তিরিশ সেট অলংকার ” শীর্ষক লেখাটির জন্যে যায় যায় দিনের এসংখ্যাটি বিখ্যাত হয়েছিল। এটি এখনও কেন যে রেখে দিয়েছি!                 

অন্য একটি পত্রিকা  ৪৭ বছর যাবত বহন করে আসছি। সেটি হলো দৈনিক সংবাদের  রোববারের সাহিত্য (তখন প্রতি রবিবার দৈনিক পত্রিকাসমূহে সাহিত্যের পাতা বের হতো)  সংখ্যা, যেখানে দাউদ হায়দারের “কালো সূর্যের কালো জোৎস্নার কালো বন্যায় ” কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছে। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৮০ বাংলা সনের ১২ ফাল্গুন রোববার, দৈনিক সংবাদের ১০ পৃষ্ঠায়। এই দীর্ঘ ও বিতর্কিত   কবিতার জন্যে কবি দাউদ হায়দারকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। যতদুর জানি, এখনও তিনি প্রবাসেই আছেন ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ও দাউদ হায়দার সমসাময়িক ছিলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন  দৈনিক সংবাদে চাকরি করতেন ও সাহিত্যের পাতা দেখতেন।  আর আমি ছিলাম দৈনিক সংবাদের একজন একনিষ্ঠ পাঠক।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন, আমাদের সময়, রাস্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ছিল একদম নীচে, মাঝামাঝি উত্তর পাশে।  এখন যেখানে সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান রেজওয়ানা চৌধুরি বন্যা বসেন সেখানেই । শিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠেই ছিল একটি লেবু চায়ের দোকান। তার পাশেই দাউদ হায়দারের ডিপার্টমেন্ট। সেখানে বসে আমরা প্রায়ই লেখালেখি ও অন্যান্য বিষয়ে আলাপআলোচনা করতাম। একদিন লেবুর চা খেতে খেতে দাউদ হায়দার আমাকে বললেন, এমন একটি কবিতা দৈনিক সংবাদে ছাপতে যাচ্ছি যারপর হয়তো দেশে থাকাই কঠিন হবে। হলোও তাই। পাবনাতে দাউদ হায়দারের পৈতৃক বাড়িতে আগুন দেয়া হলো, তার বিরুদ্ধে নাস্তিক ও  নানা ধরনের স্লোগানসহ আন্দোলন শুরু হলো, মামলা হলো। শেষপর্যন্ত দাউদ হায়দার বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন। তার সেই কবিতার শিরোনামই ছিল, “কালো সূর্যের কালো জোৎস্নার কালো বন্যায়। “

কিশোর বয়সে আমার ভালো লাগা ও প্রিয় পত্রিকার নাম দৈনিক সংবাদ। দৈনিক পত্রিকায় আমার লেখালেখির হাতে খড়ি দৈনিক সংবাদ -এর মাধ্যমেই । দৈনিক সংবাদে খেলাঘর – এর পাতায় ১৯৬৯ সনে  “ছোটদের বিদ্যাসাগর” শিরোণামে আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। এরপর উপসম্পাদকীয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ , ফিচার ও চিঠিপত্র কলামসহ বিভিন্ন স্হানে বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

আমার সংগ্রহে থাকা কাগজপত্র নাড়াচাড়া করতে গিয়ে দেখি ,      দৈনিক সংবাদের চিঠিপত্র কলামে আমার লেখা শতশত চিঠি ছাপা হয়েছে। সেসময়ে  সন্তোষগুপ্ত, অধ্যাপক মন্জুরুল ইসলাম, সৈয়দ শামসুল হক ( কলামের নাম — হৃৎকলমের টানে), সৈয়দ আলী কবীর, আবু আহমেদ, অনিরুদ্ধ,     অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (সময় বহিয়া যায় — গাছপাথর) সহ অনেক খ্যাতিমান ব্যাক্তিবর্গ দৈনিক সংবাদে কলাম ও পোস্ট এডিটরিয়েল লিখতেন। ঐ লেখা পাঠ করে আমি আমার  প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করে চিঠিপত্র কলামে লিখতাম। ঐ চিঠি নিয়মিত ছাপা হতো।

কলাম লেখকগন স্বস্ব কলামে  পত্র লেখকের নাম উল্লেখ পূর্বক এবং বিভাগীয় সম্পাদকও  সুন্দর এবং শালীনতার সাথে ঐ চিঠির জবাব দিতেন। সকলেরই একটা দায়বদ্ধতা কাজ করতো তখন। আজকাল বোধ হয় সেরকমটা আর হয় না।

        (চলবে)

২৫ মে ২০২০

রূপায়ন টাউন।

আপনার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন